হাটে ভিড় বেড়েছে, বিক্রি ও দাম দুটোই কম

কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়লেও বিক্রি হচ্ছে কম। ব্যাপারীদের কপালে তাই দুশ্চিন্তার ভাঁজ। তাঁরা বলছেন, একটি গরুর পেছনে যে খরচ হয়েছে, ক্রেতারা এর চাইতেও কম দাম বলছেন।

কমলাপুর স্টেডিয়াম-সংলগ্ন গোপীবাগ বালুর মাঠে ১৮টি গরু নিয়ে এসেছেন ঝিনাইদহের ব্যাপারী কাউসার মিয়া। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, গত তিন দিনে মাত্র ছয়টি গরু বিক্রি করেছেন। তাও আবার প্রত্যাশিত দাম পাননি।

গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে গোপীবাগ বালুর মাঠে অস্থায়ী পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, ব্যাপারীরা ক্রেতাদের অপেক্ষায় আছেন। অনেকে ক্লান্ত হয়ে পশুর পাশে মাটিতে বসে আছেন। তাঁদের চোখমুখে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ছাপ। ক্রেতাদের উপস্থিতি কম হওয়ার কারণে দর-কষাকষি না করে ব্যাপারীদের কেউ কেউ ক্রেতাদের একবারেই দাম বলে দিচ্ছেন।

গোপীবাগ বালুর মাঠে অস্থায়ী হাটের হাসিল অফিস সূত্রে জানা যায়, গতকাল বেলা দুইটা পর্যন্ত মাত্র ৬৯টি গরু বিক্রি হয়েছে। এবার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে এই হাটের ইজারাদার (প্রায় আড়াই কোটি টাকা) পাওয়া গিয়েছিল।

বেলা সাড়ে তিনটার দিকে উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘের মাঠে গিয়েও একই চিত্র দেখা গেল। দক্ষিণ সিটির অন্য হাটগুলোর মধ্যে তুলনামূলক এই হাটে গরু বেশি উঠেছে। কিন্তু এই হাটের ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা।

এবার কোরবানিতে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যাপারীরা। তাঁরা বলছেন, বেশির ভাগ ক্রেতাই ৬০ থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে গরু পছন্দ করছেন।

উত্তর শাহজাহানপুরের অস্থায়ী হাটের ব্যাপারী মো. মোতালেব বলেন, গত বছর এক লাখ টাকা দিয়ে যাঁরা গরু কিনেছেন, তাঁরা এবার ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় গরু কেনার চিন্তা করছেন। এই বিক্রেতা বলেন, ‘পরিস্থিতি এবার এমন হয়েছে, গরু দিয়া দড়ি খালাস করতে পারলেই যেন বাঁচি।’

এদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গরু বেচাকেনা শুরু হওয়ার প্রথম দিনে ব্যাপারী এবং ক্রেতাদের মুখে মাস্ক না পরার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু গতকাল দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীদের বেশির ভাগই মাস্ক ব্যবহার করছেন। ইজারাদার এবং মাঠে অবস্থানরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সবাইকে বারবার অনুরোধ জানাচ্ছেন। হাটে প্রবেশের আগে তাপমাত্রাও পরীক্ষা করতে দেখা গেছে।

অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটগুলো দেখভাল করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি হাটেই তাঁরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন, এ জন্য নানা ধরনের প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।

গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় বসা চারটি পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রথম দুই দিনের চেয়ে ক্রেতার উপস্থিতি বেড়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতার দর-কষাকষিতে জমে উঠেছে হাট। অনেকে পছন্দের গরু কিনে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন। কেউ আবার পিকআপে করে নিয়ে যাচ্ছেন গরু। গরুর পাশাপাশি ছাগল অথবা শুধু ছাগল কিনেও ফিরছেন অনেকে।

রাজধানীর একমাত্র স্থায়ী পশুর হাট গাবতলী হাটে ঈদ আর পশুর হাটের আমেজ পাওয়া গেল। একদিকে ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষ আর অন্যদিকে কোরবানির পশু কিনতে হাটে আসা ক্রেতাদের ভিড়। সব মিলিয়ে বাস টার্মিনাল ও হাট এলাকায় প্রচুর মানুষ। কিছুক্ষণ পরপরই হাটের সামনের অংশে মূল সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছিল। জট ছাড়াতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও তৎপর ছিলেন।

তবে হাটে ক্রেতার ভিড় বাড়লেও বিক্রি নিয়ে হতাশার কথা জানালেন ব্যবসায়ীরা। একাধিক ব্যবসায়ী বড় ধরনের লোকসানের শঙ্কাও করছেন। বগুড়ার ব্যবসায়ী শিমুল ইসলাম জানান, তিনি দুই ট্রাক গরু নিয়ে এসেছেন। তিন দিনে অর্ধেক গরুও বিক্রি করতে পারেননি। গরুর দামও তেমন একটা নেই।

কাউলা শিয়ালডাঙা পশুর হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, হাটে অন্তত চার হাজার গরু উঠেছে। এই হাটেও ক্রেতার ভিড় দেখা গেছে। অনেকেই হাটে ঘোরাঘুরি করছিলেন। ছোট ছোট দলে চার-পাঁচজন করে গরু দেখছেন, দাম শুনছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনবরত মাইকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও ক্রেতা-বিক্রেতা ও ইজারাদারের প্রতিনিধিরা সেসব মানছেন না।

কাওলার হাটে সিরাজগঞ্জের মামুন শেখ ১৩টি দেশি ষাঁড় এনেছেন। প্রতিটি ষাঁড়ের দাম তিনি হাঁকছেন ৯০ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘পাঁচটা বিক্রি করতে পেরেছি। ক্রেতারা অনেক কম দাম বলছেন। গরু বিক্রি করতে না পারলে বন্যার কারণে গ্রামে নিয়ে গিয়ে রাখতেও পারব না।’

পূর্বাচল ডুমনির হাট ঘুরে দেখা গেছে, বেচাবিক্রি তেমন নেই। ক্রেতারা ঘোরাঘুরি করে দাম শুনে চলে যাচ্ছেন। অনেকে বড় আকারের গরুর দাম আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইছেন। কিন্তু কিছু না বলে দাম শুনেই চলে যাচ্ছেন।

কাউলা শিয়ালডাঙা হাট পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন ডিএনসিসি অঞ্চল-৭-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতাকাব্বির আহমেদ। তিনি জানান, মঙ্গল ও বুধবার দুই দিন হাটে স্বাস্থ্যবিধি অমান্য, রাস্তায় হাট বসিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি ও হাটের বাইরে পশু বিক্রি—এসব কারণে বেশ কিছু জরিমানা করা হয়েছে। হাটে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অনেকেই সচেতন নন। তাঁদের এসব মানানোটাও কষ্টসাধ্য।

The news collected

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: