জাতীয়করন হল শিক্ষা উন্নতির পৃর্বশর্ত: দিদারুল ইসলাম

জাতি গঠনে যাদের অবদান তারা পারে দেশকে সুন্দর জাতি উপহার দিতে। কিন্তু তাদের জীবনের জীর্ণতা বাধা শিক্ষা উন্নয়নে। চাই জাতীয়করন যাতে শিক্ষা ও শিক্ষকদের সমাধান। কিন্তু কেন? বাংলাদেশের শিক্ষকদের অবস্থা সম্পর্কে আলোকপাত করার পূর্বে আসুন দেখে নেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকের অবস্থান।  পত্রিকায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চীনের শিক্ষকরা সেদেশের সকল নাগরিকের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে থাকেন।

চীনে একজন ডাক্তার যে সুবিধা ভোগ করেন, একজন শিক্ষক তার কাছাকাছি সুবিধা ভোগ করেন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, গ্রীস, দক্ষিণ কোরিয়া, মিশর প্রভৃতি দেশের শিক্ষকরা সর্বোচ্চ মুল্যায়ন পেয়ে থাকেন। ব্রিটেনের প্রধান শিক্ষকরা যে মুল্যায়ন পেয়ে থাকেন, পৃথিবীর আর কোথাও তা নেই। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক এবং মিশরের বাবা-মা’রা তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষক হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশী উৎসাহ দিয়ে থাকেন।

সিঙ্গাপুরের শিক্ষকরা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ বেতন পেয়ে থাকেন। তাদের বেতন গড়পড়তায় ৪৫,৭৫৫ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৩৬ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা); মাসিক হিসাবে তিন লক্ষ টাকার চেয়েও বেশি। দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী এবং জাপানে শিক্ষকদের বেতন ৪০,০০০ মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৩২ লক্ষ টাকা) চেয়ে বেশী, যা মাসিক হিসাবে প্রায় ২ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা। আর ব্রিটেনে শিক্ষকরা পান ৩৩,৩৭৭ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২৬ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা); মাসিক হিসাবে প্রায় ২ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা।

এবার আসা যাক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারিভাবে পরিচালিত হয়। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা উত্তর একটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের প্রায় ৩৭ হাজার প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করণ করেছিলেন এবং তার সুযোগ্য উত্তরসুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো প্রায় ২৬ হাজার প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করণ করেন। পিতা ও কন্যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজ দেশের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে সরকারি। একজন প্রাথমিক শিক্ষকের মাসিক গড় বেতন প্রায় ২৫ হাজার টাকা।

পক্ষান্তরে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অবস্থা খুবই করুণ। মাত্র ২% প্রতিষ্ঠান সরকারি আর বাকি ৯৮% প্রতিষ্ঠান বেসরকারি। সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। সরকারি শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের মূল বেতনের পাশাপাশি  মূল বেতনের ৪৫-৫০% বাড়িভাড়া, ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, মূল বেতনের ১০০% হারে দু’টি উৎসব ভাতা, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, শিক্ষা ভাতা, টিফিন ভাতা, বদলি সহ নানাবিধ সুবিধা পেয়ে থাকেন।

পক্ষান্তরে, ৯৮% শিক্ষার ভার যাদের উপর নিপতিত, সেই বেসরকারি শিক্ষকরা উপরোক্ত সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সবচেয়ে পীড়াদায়ক যে বিষয়টি সেটি হল, এতদিন এমপিওভূক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের সরকার প্রদত্ত বেতনকে ‘বেতনের সরকারি অংশ” হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ফরাস উদ্দিন কমিশন প্রণীত বর্তমান পে কমিশন এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের বেতনকে “অনুদান সহায়তা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। দেশের ৯৮% শিক্ষার দায়িত্ব নিয়ে যারা দিবারাত্র মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময় স্বরুপ তাদেরকে অনুদান প্রদান করা- শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় অংশের এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে?

সরকারি বেতন স্কেলে মূল বেতন পেলেও প্রিন্সিপাল থেকে দপ্তরী পর্যন্ত সবার বাড়িভাড়া মাত্র ১০০০ টাকা, বর্তমান বাজারে যা দিয়ে একটি কুড়ে ঘরে থাকাও দুস্কর। চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা, অথচ একজন ডাক্তারের একবারের ভিজিটও তার চেয়ে বেশী। মূল বেতনের ২৫% বোনাস, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, একজন শিক্ষককে নিজের ও নিজের পরিবার ও আত্নীয় স্বজনের চাহিদা মেটাতে না পেরে তাদের কাছে লজ্জিত হওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা। বদলি না থাকায় একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষককে অনিচ্ছা সত্বেও আজীবন একই প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। পূর্বে একটিমাত্র টাইমস্কেল পেয়ে সারা জীবনে একবার বেতন বৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও বর্তমান পে-স্কেলে তা বাতিল করা হয়।

স্কুল শিক্ষকদের পদোন্নতির কোন সুযোগ নেই। কলেজ শিক্ষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির একটি সুযোগ থাকলেও অনুপাত প্রথা (৫ঃ২) এর কারণে ৭৩% প্রভাষককে সারা জীবন একই পদে থেকে অবসরে যেতে হয়। পাশাপাশি টাইমস্কেল বাতিল করে উচ্চতর স্কেল চালু করায় যেখানে ৮ বছর পর একজন প্রভাষক ৭ম গ্রেডে যেতেন সেখানে ১০ বছর পর ৮ম গ্রেডে বেতন বাড়বে মাত্র ১ হাজার টাকা!!! সরকারি স্কুল/কলেজে যে সিলেবাস, সেই একই সিলেবাস পড়িয়ে, সমান যোগ্যতা নিয়ে, একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে, একই কর্মঘন্টায় পাঠদান করে স্কুল পর্যায়ের একজন শিক্ষকের বেতন ১২,৫০০- ১৬০০০ টাকা আর কলেজ পর্যায়ে একজন প্রভাষক পান ২২০০০ টাকা। অথচ একজন সরকারি অফিসের পিয়নের বেতন ও ২৫০০০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি।

জাতীয়করণের দাবিতে বিগত তিন বছরের ক্রমাগত শিক্ষক আন্দোলন বিশেষ করে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের নেতৃত্বে জাতীয় প্রেসক্লাবে লাগাতার ২০ দিন আমরণ অনশনের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুইজন সচিব এসে ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ঘোষণা দিয়ে যান। সেই মোতাবেক এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা গত বছরের জুলাই মাস থেকে ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন শিক্ষকদের কপালে সয়নি।

চলতি বছর থেকে শিক্ষকদের বেতন থেকে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে কোনরুপ বাড়তি সুবিধা না দিয়ে পূর্বের ৬% এর সাথে অতিরিক্ত ৪% অর্থাৎ মোট ১০% চাঁদা কর্তন করা হচ্ছে। যার প্রতিবাদে সারাদেশে শিক্ষকদের আন্দোলন চলছে। আজ দেশ যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে, পদ্মা সেতুর মত দুঃসাহসিক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, ঠিক তেমনি মুহুর্তে জাতির মেরুদন্ড গড়ে দেওয়ার কারিগর শিক্ষকদের এ দুরবস্থার অবসানকল্পে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে কোন প্রকার আয় ছাড়া সম্পুর্ণ সরকারী ব্যয়ে প্রায় ২৬ হাজার প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করন করেছেন তেমনি সম্ভব জাতীয়করন।

Copyright© by Kutubdia News

লেখক: দিদারুল ইসলাম – যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ এমপিওভুক্ত অনলাইন পরিষদ এন্ড দৈনিক কুতুবদিয়া নিউজ চেয়ারম্যান।

kutubdianews

দৈনিক কুতুবদিয়া নিউজ সর্বস্তরের খবর অনুসন্ধানে সত্য তুলে ধরবো আমরা

Leave a Reply

x
%d bloggers like this: